সফর অবস্থায় নামাজ
সফর অবস্থায় নামাজ আদায় করার বিধি-বিধান :-
যে সফর দ্বারা শরীআতের আহকাম পরিবর্তিত হয়, তা হল তিন দিন তিন রাত্রি পরিমাণ দূরত্বে যাওয়ার ইচ্ছা করা উটের গতি বা হেটে চলার গতি হিসাবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- মুকীম পূর্ণ একদিন একরাত্র মাস্হ করবে, আর মুসাফির করবে তিন দিন তিন রাত্র।
যে সফর দ্বারা শরীআতের আহকাম পরিবর্তিত হয়, তা হল তিন দিন তিন রাত্রি পরিমাণ দূরত্বে যাওয়ার ইচ্ছা করা উটের গতি বা হেটে চলার গতি হিসাবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- মুকীম পূর্ণ একদিন একরাত্র মাস্হ করবে, আর মুসাফির করবে তিন দিন তিন রাত্র। মাস্হ্র অবকাশ মুসাফির সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে শামিল করেছে। আর তার অনিবার্য প্রয়োজন হবে (সফরের) সময়সীমা সম্প্রসারণ। ইমাম আবূ ইউসূফ (র.) তা নির্ধারণ করেছেন দুই দিন এবং তৃতীয় দিনের অধিকাংশ সময় পরিমাণ দ্বারা। আর ইমাম শাফিঈ (র.) নির্ধারণ করেছেন একদিন একরাত্র পরিমাণ দ্বারা। আর উভয়ের বিপরীতে প্রমাণ হিসাবে আলোচ্য হাদীছই যথেষ্ট। আর উল্লেখিত পথচলা দ্বারা মধ্যমগতির পথ চলা উদ্দেশ্য। ইমাম আবূ হানীফা (র.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি মনজীল দ্বারা দূরত্ব নির্ধারণ করেছেন। আর এ মত হল প্রথমোক্ত দূরত্ব পরিমাণের নিকটবর্তী। ফরসখ মাইল দ্বারা দূরত্ব নির্ধারণ গ্রহণযোগ্য নয়। এ-ই বিশুদ্ধ মত। আর নৌপথের চলার গতিকে পরিমাণ হিসাবে গ্রহণ করা হবে না। অর্থাত্ স্থল পথের জন্য নৌপথের যাত্রাকে পরিমাপ হিসাবে গণ্য করা হবে না। আর সমুদ্রে তার উপযোগী যাত্রা পরিমাপ বিবেচ্য, যেমন পার্বত্য পথের হুকুম। ইমাম কুদূরী (র.) বলেন, চার রাকাআত বিশিষ্ট সালাতে মুসাফিরের জন্য ফরজ হল দুই রাকাআত। এর অধিক আদায় করবে না। ইমাম শাফিঈ (র.) বলেন, মুসাফিরের (মূল) ফরজ চার রাকাআত। তবে কসর করা্ হল রুখছত, সাওমের উপর কিয়াস করে।
আমাদের দলীল এই যে, দ্বিতীয়ার্থ দুই রাকাআত কাযা করতে হয় না এবং তা তরক করার কারণে গুণাহ্ হয় না। আর এ হল নফল হওয়ার আলামত। পক্ষান্তরে সাওমের বিষয়টি এর বিপরীত। কেননা তা কাযা করতে হয়। আর যদি চার রাকাআত পড়ে নেয় এবং দ্বিতীয় রাকাআতে তাশাহ্হুদ পরিমাণ বৈঠক করে, তাহলে প্রথম দুই রাকাআত ফরজ হিসাবে আদায় হয়ে যাবে এবং শেষ দুই রাকাআত নফল হবে। ফজরের সালাতের উপর কিয়াস করে। অবশ্য সালাম বিলম্ব করার কারণে গুণাহ্গার হবে। আর যদি দ্বিতীয় রাকাআতে তাশাহ্হুদ পরিমাণ বৈঠক না করে তাহলে সালাত বাতিল হয়ে যাবে। কেননা, ফরযের রুকনসমূহ পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই নফল তার সাথে মিলে গেছে। মুসাফির যখন বস্তির আবাদী ত্যাগ করবে তখন থেকেই দু’রাকাআত আদায় করবে। কেননা, বস্তিতে প্রবেশের সাথে মুকীম হওয়া সম্পৃক্ত। সুতরাং সফরের সম্পর্ক হবে বস্তি থেকে বের হওয়ার সাথে। এ সম্পর্কে আলী (রা.) থেকে নিম্নোক্ত বানী বর্ণিত আছে। যদি আমরা বস্তির গৃহসমূহ অতিক্রম করি তখনই অবশ্য সালাত কসর করব। সফরের হুকুম অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না কোন শহরে বা বস্তিতে পনের দিন বা তার বেশী থাকার নিয়্যত করে। যদি এর কম সময় থাকার নিয়্যত করে তাহলে কসর করবে। কারণ সফরের একটি মিয়াদ নির্ধারণ করা জরুরী। কেননা সফরে স্বভাবতঃ বিরতি ঘটে থাকে। তাই আমরা সফরের মিয়াদ নির্ধারণ করেছি (দুই হায়যের মধ্যবর্তী) তুহরের মিয়াদ দ্বারা। কেননা উভয় মিয়াদই কিছু আহকাম আরোপ করে। আর এটি ইব্ন ‘আব্বাস ও ইব্ন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর এ ধরণের ক্ষেত্রে সাহাবীর বাণী হাদীছের মত।
শহর বা বস্তির শর্ত এ দিকে ইংগিত করে যে, মাঠে প্রান্তরে ইকামতের নিয়্যত করা সহীহ্ নয়। এ-ই জাহির রিওয়ায়াত। যদি এমন সুদৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে কোন শহরে প্রবেশ করে যে, আগামীকাল অথবা পরশু এখান থেকে বের হয়ে যাবে এবং সে মুকীম হওয়ার নির্ধারিত মেয়াদের নিয়্যত করল না; এমন কি এভাবে সে কয়েক বছর অবস্থান করল, তাহলে সে কসর করতে থাকবে। কেননা, ইব্ন ‘উমর (রা.) আজারবাইজান শহরে ছয়মাস অবস্থান করেছেন এবং তিনি এ সময় কসর করতে থাকেন। আরও বহু সাহাবায়ে কিরাম থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। সৈন্যবাহিনী যখন শত্রু এলাকায় প্রবেশ করে এবং ইকামতের নিয়্যত করে তখন তারা কসরই পড়বে। তদ্রুপ যদি শত্রু দেশের কোন শহর বা দুর্গ অবরোধ করে। কেননা শত্রুভূমিতে প্রবেশকারীর অবস্থা দোদুল্যমান; হয়ত পরাজিত হয়ে স্থান ত্যাগ করবে, নয়ত (শত্রুভূমিকে) পরাস্ত করে তথায় স্থায়ী হবে। সুতরাং তা ইকামাতের স্থান হতে পারে না। অনুরূপভাবে (কসর আদায় করবে) যদি (মুসলিম) বাহিনী দারুল ইসলামের বিদ্রোহীদের শহর বহির্ভূত কোন এলাকায় অবরোধ করে কিংবা সমুদ্রে তাদের অবরোধ করে। কেননা তাদের অবস্থা তাদের নিয়্যতের দৃঢ়তা বাতিল করে।
যুফার (র.) এর মতে উভয় অবস্থায় (ইকামাতের নিয়্যত) গ্রহণযোগ্য হবে, যদি মুসলিম বাহিনীর শক্তিতে প্রাধান্য থাকে। কেননা, সে অবস্থায় বাহ্যতঃ তারা অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম। ইমাম আবূ ইউসূফ (র.) এর মতে যদি তারা বস্তি এলাকায় থাকে তবে (নিয়্যত) গ্রহণযোগ্য হবে; কেননা বস্তি এলাকা ইকামত করার স্থান। আর তাঁবুবাসীদের সম্পর্কে ইকামতের নিয়্যত কারো কারো মতে দুরস্ত নয়। তবে বিশুদ্ধ মত এই যে, তারা মুকীম বিবেচিত হবে। ইমাম আবূ ইউসূফ (র.) থেকে তাই বর্ণিত রয়েছে। কেননা ইকামত হলো (মানুষের জীবনের) আসল অবস্থা। সুতরাং এক চারণভূমিতে যাওয়ার কারণে তা বাতিল হবে না্। আর যদি মুসাফির যদি ওয়াক্তিয়া সালাতের ক্ষেত্রে মুকীমের পিছনে ইক্তিদা করে তাহলে চার রাকাআত পুরা করবে। কেননা তখন অনুসরণের বাধ্যবাধকতায় তার ফরজ চার রাকাআতে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। যেমন তার নিজের ইকামতের নিয়্যত দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে যায়। কারণ, পরিবর্তনকারী বিষয় (অর্থাত্ ইকতিদা) ‘সবব’ এর সাথে (অর্থাত্ ওয়াক্তের সাথে) যুক্ত হয়েছে। যদি মুকীম ইমামের সঙ্গে কাযা সালাতে শামিল হয়, তবে তা জাইয হবে না। কেননা, ফরজ পরিবর্তিত হয় না ওয়াকতের পর সবব বিলুপ্ত হওয়ার কারণে; যেমন ইকামতের নিয়্যত দ্বারা পরিবর্তিথ হয় না। এমতাবস্থায় এটা বৈঠক ও কিরাতের ক্ষেত্রে নফল আদায়কারীর পিছনে ফরজ আদায়কারীর ইকতিদার মত হয়ে যাবে, যা দুরস্ত নয়।
মুসাফির যদি দুই রাকাআতে মুকীমদের ইমামতি করে তবে সে (দুই রাকাআত শেষে) সালাম ফিরাবে আর মুকীমগণ তাদের সালাত পূর্ণ করে নিবে। কেননা, মুকতাদীরা দুই রাকাআতের ক্ষেত্রে (মুসাফির ইমামের) অনুসরণে বাধ্যবাধকতা গ্রহণ করেছে। সুতরাং অবশিষ্ট সালাতের ক্ষেত্রে তারা মাসবূকের মত একাকী হয়ে পড়বে। তবে বিশুদ্ধ মতে সে কিরাত পড়বে না। কেননা তারা তাহরীমার বেলায় মুকতাদী, অন্যান্য কাজের বেলায় নয়। আর ফরজ (কিরাত) আদায় হয়ে গেছে। সুতরাং সতর্কতা হিসাবে কিরাত তরক করবে। মাসবূকের বিষয়টি এর বিপরীত। কেননা, সে নফল কিরাত পেয়েছে। সুতরাং (কিরাতের) ফরজ বিরতি আদায় হয়নি। সুতরাং (তার ক্ষেত্রে) কিরাত পড়াই উত্তম। সালাম ফিরানোর পর (মুসাফির) ইমামের পক্ষে একথা বলে দেওয়া মুসতাহাব যে, তোমরা তোমাদের সালাত পূর্ণ করে নাও। আমরা মুসাফির কাফেলা। কেননা, মুসাফির অবস্থায় মক্কাবাসীদের ইমামতি করার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এরূপ বলেছিলেন।
মুসাফির যখন আপন শহরে প্রবেশ করবে তখন সালাত পূর্ণ করবে। যদিও সেখানে সে ইকামতের নিয়্যথ না করে। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ও সাহাবায়ে কিরাম সফর করতেন। অতঃপর ইকামাতের নতুন নিয়্যত ব্যতীত ওয়াতানের দিকে ফিরে এসে মুকীম হিসাবে অবস্থান করতেন। যদিও কারও নিজস্ব আবাসভূমি থাকে অতঃপর সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে অন্য স্থানকে আবাসভূমি রূপে গ্রহণ করে, তবে অতঃপর সফর করে প্রথম আবাসভূমিতে প্রবেশ করে, তবে সে কসর পড়বে। কেননা প্রথমটি তার আবাসভূমি থাকে না। একথা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) নিজেকে মক্কায় মুসাফির গণ্য করেছিলেন। এর কারণ এই যে, নীতি হল, স্থায়ী আবাসভূমি অনুরূপ আবাসভূমি দ্বারা বাতিল হয়ে যায়, সফর দ্বারা হয় না। পক্ষান্তরে অস্থায়ী অবস্থান স্থল দ্বারা, সফর দ্বারা এবং স্থায়ী আবাসভূমি দ্বারা বাতিল হয়ে যায়। মুসাফির যদি মক্কায় ও মীনায় পনের দিন থাকার নিয়্যত করে তবে সে কসর পড়বে। কেননা দুই স্থানে ইকামতের নিয়্যত যদি এ’ তেবার করা হয়, তাহলে বিভিন্ন জায়গার ইকামতের নিয়্যতকেও মিলিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। আর তা নিষিদ্ধ। কেননা, সফর তো বিভিন্ন স্থানে অবস্থান থেকে মুক্ত নয়। তবে যদি উভয়ের মধ্যে একটিতে রাত্রিযাপন করার নিয়্যত করে থাক তবে সে সে স্থানে প্রবেশ করার সাথে সাথে মুকীম হয়ে যাবে। কেননা, লোকের ইকামতের বিষয়টি তার রাত্রি যাপনের স্থানের সাথে সম্পৃক্ত।
No comments:
Post a Comment